संस्कृत साहित्य
»Discuss the origin and development of Sanskrit fiction.
» সংস্কৃত গল্পসাহিত্যের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলােচনা কর ।
আমরা সাধারণত গল্প সাহিত্যকে তিনভাবে দেখি—
( ক ) পশুপাখি অবলম্বনে রচিত গল্প ।
( খ ) মানুষ , গন্ধর্ব প্রভৃতি অবলম্বনে রচিত গল্প ।
( গ ) জনপ্রিয় লােককথা ।
প্রথমভাগে ঋকবেদের মনুমৎস্যকথা , ভেকসূক্ত , ছান্দোগ্যোপনিষদে কুকুরের গল্প , পুরাণে নানা নীতিগৰ্ভকথা , মহাভারতে পাখির গল্প , রামায়নে নীতিকথার উল্লেখ প্রভৃতি প্রাচীন ভারতের গল্পসাহিত্যের ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয় । দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগে আমরা বৌদ্ধ ও জৈন লৌকিক সাহিত্য পাই ।
Prof. Keith গল্প সাহিত্যকে বা কথাসাহিত্যকে দুটি ধারায় বিভক্ত করেছেন -
( ক ) রম্য কথা— এই ধারায় পাত্রপাত্রী মানব সম্প্রদায়ভুক্ত ।
( খ ) হিতকথা— এই ধারার পাত্রপাত্রী মানবেতর পশু - পাখী প্রভৃতি প্রাণী ।
গদ্য সাহিত্য তিনভাগে বিভক্ত— ( ১ ) কথা ( কবি কল্পিত ) , ( ২ ) আখ্যায়িকা ( ইতিহাস ভিত্তিক ) , ( ৩ ) উপকথা ( গল্প বা কথাসাহিত্য ) ।
উপকথা তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত— ( ক ) খণ্ডকথা , ( খ ) কথানিকা , ( গ ) পরিকথা ।
পরিকথা দুইভাগে বিভক্ত—
( ১ ) সাধারণ : গুণাঢ্যের ‘ বৃহৎকথা ’ , বুদ্ধস্বামীর ‘ শ্লোকসংগ্রহ ’ , ক্ষেমেন্দ্রের ‘ বৃহৎকথামঞ্জরী ' , সােমদেবের ‘ কথাসরিৎসাগর ’ শিবদাসের ‘ বেতালপঞ্চবিংশতি ' প্রভৃতি ।
( ২ ) পশুপাখির গল্প : বিয়ুশর্মার ' পঞ্চতন্ত্র , নারায়ণশৰ্মার ‘ হিতােপদেশ ’ , চিন্তামণিভট্টের ‘ শুকসপ্ততিকথা প্রভৃতি ।
নিম্নে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গল্পসাহিত্য সংক্ষেপে আলােচনা করা হল—
🔱 বৃহৎকথা : গল্প সাহিত্যের সর্বপ্রাচীন বৃহত্তম গ্রন্থটি হল গুণাঢ্য রচিত ' বৃহকথা ' । পৈশাচী । ভাষায় একলক্ষ শ্লোকে এই গ্রন্থটি রচিত । মূল বৃহকথা গ্রন্থটি বর্তমানে বিলুপ্ত । মূল এই গ্রন্থটিকে অবলম্বন করে পরবর্তীকালে সংস্কৃত ভাষায় তিনটি গ্রন্থ রচিত হয় ।—
( ১ ) বুদ্ধস্বামীর বুহংকথাশ্লোক সংগ্রহ , ( ২ ) ক্ষেমেন্দ্রের বৃহকথামঞ্জরী , ( ৩ ) সােমদেবর কথাসরিৎসাগর ।
এই তিনটি গল্পগ্রন্থের মধ্যে সবথেকে প্রচলিত গল্পগ্রন্থ হল — কথাসরিৎসাগর ।
🔱 কথাসরিৎসাগর : কথাসরিৎসাগর শুধু সংস্কৃত কথা সাহিত্যের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নয় , পৃথিবীর প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম গল্প সংকলনগ্রন্থ । ভারতীয় রূপকথার উৎস গুণাচ্যের পৈশাচী প্রাকৃতে লেখা মহাগ্রন্থ ' বৃহকথা অবলম্বনে কাশ্মীরের পণ্ডিত সােমদেব ‘ কথাসরিৎসাগর ’ রচনা করেন ।
সােমদেবের ‘ কথাসরিৎসাগর ’ গ্রন্থ থেকে তৎকালীন সমাজের অনেক মূল্যবান তথ্য জানা যায় যেমন , তখন সমুদ্রপথে নৌবাণিজ্যের প্রচলন ছিল । স্থাপত্য শিল্পের বিস্তারলাভ ঘটেছিল , সমাজে শৈব ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব লক্ষ্য করা গিয়েছিল , সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষ যেমন চোর , জুয়াড়ি , ধূর্ত , ভিক্ষুক , বেশ্যাগামী , কপট প্রভৃতির চিত্রণ এই গ্রন্থের বিশেষত্ব । জনগণের চরিত্রে যে হীনতা ও উৎশৃঙ্খলতা বেড়ে উঠেছিল ; তারই প্রকাশ করে সােমদেব তৎকালীন সমাজ সম্পর্কে আমাদের অবহিত করেছেন । এইদিক দিয়ে এই গল্পগ্রন্থটিকে সমাজের দলিল বলা যেতে পারে ।
🔱 পঞ্চঅল্প : পৃথিবীর গল্পসাহিত্যের ইতিহাসে সংস্কৃত ভাষায় রচিত পঞতন্ত্রের স্থান অনন্য । বিষ্ণুশর্মা নামক এক পণ্ডিত মহিলারােপ্য নগরের রাজা অমরশক্তির বিবেকহীন তিন পুত্রকে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদানের জন্য এই গ্রন্থ রচনা করেন । মূল গল্পের মধ্যে প্রাসঙ্গিকভাবে অনেকগুলি ছােট ছােট গল্পের সন্নিবেশ এই গ্রন্থের মূল বৈশিষ্ট্য । প্রতিটি গল্পের শেষে নীতি অভিব্যক্ত হয়েছে হৃদগ্রাহী শ্লোকে ।
মূল গ্রন্থটি পাঁচটি তন্ত্রে বিভক্ত— মিত্ৰভেদ , মিত্রপ্রাপ্তি , কাকোলুকীয় , লন্ধপ্রণাশ এবং অপরীক্ষিতকারক । মিত্রভেদনামক প্রথম তন্ত্রে আছে ২২ টি মনােজ্ঞ গল্প । দমনক ও করটক নামক দুই শৃগাল , পিঙ্গলক নামক সিংহ এবং সঞ্জীবক নামক বৃষভ এই তন্ত্রটির প্রধান চরিত্র । গল্পের ছলে এখানে পরিবেশিত হয়েছে সামি । ভেদ প্রভৃতি রাজনৈতিক তত্ত্ব । মিত্রপ্রাপ্তি নামক দ্বিতীয় তন্ত্রটি ছয়টি গল্পের সমাবেশে সমৃদ্ধ । তৃতীয় তল্ল কোলকীয় সন্ধি ও বিগ্রহ অবলম্বনে রচিত । প্রকাশ এবং অপরীক্ষিতকারক নামক দুটিতে যথামে । ১৬ টি ও ১৫ টি গল্পের সমাবেশ আছে ।
🔱 সূল্যায়ন : পতন্ত্রের ভাষা সহজ , সরল ও মার্জিত । এতে দীর্ঘবর্ণনা , ভাবপ্রবণতা বা গাণ্ডিত্যাণ । লেশমাত্র নেই । এই গ্রন্থের গল্পগুলি চিত্তাকর্ষক এবং সুকুমারমতি বালকবালিকাদের নীতিশিক্ষার পক্ষে বিশেষ উপযােগী । গ্রন্থকার বিশৰ্মা , রাজনীতি ও বাস্তবজীবনের অভিজ্ঞতায় যে দক্ষ ছিলেন তা তাঁর গল্পের মধ্যে পাই । নীতিগত শ্লোকগুলিকে যে প্রাঞ্জল ও সুচারুভাষায় লিপিবদ্ধ করেছেন তা সত্যই প্রশংসার দাবি রাখে ।
🔱 হিতোপদেশ : গল্পসাহিত্যের ইতিহাসে এখনও যাদের স্থান মানুষের মনমন্দিরে সুপ্রতিষ্ঠিত , তাদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল নারায়ণশৰ্মার হিতােপদেশ । গ্রন্থটি পঞ্চতন্ত্রের রচনারীতির আদর্শে মূল গল্পের মধ্যে প্রাসঙ্গিক ছােটো ছােটো গল্পের সমাবেশে রচিত । হিতােপদেশের ৪৩ টি গল্পের মধ্যে ২৫ টি গল্প পঞ্চতন্ত্রর থেকে গৃহীত । গ্রন্থের প্রস্তাবিকা নামক প্রারম্ভিক অংশে লেখক এই ঋণ স্বীকার করেছেন—
“ পতন্ত্ৰাথান্যস্মাগ্রন্থদাকৃষ্য লিখতে । ”
হিতােপদেশ চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত — মিত্রলাভ , সুহূদভেদ , বিগ্রহ ও সন্ধি । এই গ্রন্থের গঠনে ও আঙ্গিকে পঞতন্ত্রের প্রভাব পরলক্ষিত হলেও গ্রন্থকারের ঘটনাবিন্যাস কৌশল তার স্বকীয় । পঞ্চতন্ত্র গৃহীত কথাগুলিতেও পঞতন্ত্রের ক্রম অনুসৃত হয়নি । গল্পগুলাের তথ্য প্রম্পরাতে অনেক বৈচিত্র্য আছে । কামন্দকীয় নীতিশাস্ত্র থেকে এখানে অনেক শ্লোক উদ্ধৃত হয়েছে । মুনি - মূষিক কথা বীরবরের উপাখ্যান , ব্রাক্ষ্মণের হটকারিতায় উপকারক নকুলের মৃত্যু , সুন্দ - উপসুন্দের কাহিনী , নীলবর্ণ শৃগালের গল্প প্রভৃতি লেখকের রচনার গুণে কতই না মনােজ্ঞ হয়ে উঠেছে । ভাষার সহজ , সরল আবেদন সহজেই সকলের হৃদয়কে স্পর্শ করে । কথারছলে বালকদের নীতিশিক্ষা দানের জন্যই গ্রন্থকারের এই প্রয়াস—
কথাচ্ছলেন বালানাং নীতিস্তদিহ কথ্যতে । ”
পণ্ডিত নারায়ণশমার এই প্রয়াস সার্থকতায় পর্যবসিত হয়েছে ।
🔱 সিংহাসলদ্বাভিংশিকা : বাইশটি গল্পের সংকলন ‘ সিংহাসনদ্বাত্রিংশিকা’অপর একটি জনপ্রিয় গল্পগ্রন্থ । মহারাজ বিক্রমাদিত্যের মৃত্যুর পর তার ইন্দ্রদত্ত সিংহাসনটি কালক্রমে ভূগর্ভে প্রােথিত হয় পরে ধরাধিপতি ভােজরাজ সেই সিংহাসন উদ্ধার করেন । ভােজরাজ সেই সিংহাসনে আরােহনের উপক্রম করলে সিংহাসনগাত্রে খােদিত বাইশটি পুত্তলিকা জীবন্ত হয়ে ওঠে এবং প্রত্যেকে বিক্রমাদিত্য সম্পর্কে এক একটি গল্প বলে । বিক্রমাদিত্যের ন্যায় গুণসম্পন্ন না হলে এই সিংহাসনে আরােহনের যােগ্যতা অর্জন করা যায় না । এই মূলতত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যেই গল্পগুলির অবতারণা । মূল গ্রন্থের রচয়িতা এবং রচনাকাল অজ্ঞাত ।
🔱 শুকসপ্ততিকথা : চিন্তামণি ভট্ট রচিত শুকসপ্ততিকথা গল্প সাহিত্যে বিশেষ উল্লেখযােগ্য । দেবদাসের গৃহপালিত একটি শুকপাখির দ্বারা কথিত ৭০ টি গল্পের সংকলন এই গ্রন্থটি । দেবদাসের পরমাসুন্দরী পত্নীকে অপহরণ করার জন্য রাজা দেবদাসকে কাজের দায়িত্ব দিয়ে বিদেশে প্রেরণ করেন । গৃহপালিত শুকটি দেবদাসের পত্নীর মনােভাব বুঝতে পারে । প্রতিরাত্রে দেবদাসের পত্নী গৃহত্যাগের উপক্রম করলে শুকপাখিটি তাকে একটি করে গল্প বলে । এইভাবে গল্পের আকর্ষণে ৭০ টি রজনী অতিবাহিত হয় , দেবদাসের পত্নীর আর গৃহত্যাগ করা হয় না । ইতিমধ্যে দেবদাস গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন । অনুরূপ কৃতকর্মের ফলকে কীভাবে ভােগ করেছিল তা স্মরণ করিয়ে দেওয়াই প্রতিটি গল্পের মূল উদ্দেশ্য ।
🔱 বেতালপঞ্চবিংশতি : ২৫ টি গল্পের সংকলন বেতালপঞ্চবিংশতি সংস্কৃত গল্পসাহিত্যের অন্যতম অমূল্য সম্পদ , গল্প গ্রন্থটির রচয়িতা হলেন শিবদাস । রাজা বিক্রমাদিত্যকে এক সন্ন্যাসী প্রতিদিন একটি করে ফল উপহার দিতেন । সেই ফলের মধ্যে একটি রত্ন পাওয়া যেত । সন্ন্যাসীর অনুরােধে বিক্রমাদিত্য শ্মশানের কোনাে বৃক্ষ থেকে একটি শব আনতে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ হন । সেই শবকে আশ্রয় করে একটি পিশাচ বা বেতাল অবস্থান করত । বিক্রমাদিত্য যতবার বৃক্ষ থেকে দোদুল্যমান শবকে নীচে নামান বেতাল ততবারই তাঁকে একটি করে গল্প বলে এবং গল্পের বর্ণিত সমস্যা বা ধাধার সমাধান করতে বলে । বিক্রমাদিত্য বেতালের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেন আর রাজার মৌনভঙ্গের সুযােগে বেতালাশ্রিত সেই শব বৃক্ষে আরােহন করে । এইভাবে বেতাল কথিত ২৫ টি গল্পের সংকলন হল বেতালপঞ্চবিংশতি ।
উপরিউক্ত গল্পগ্রন্থগুলি ছাড়া বিদ্যাপতির চুয়াল্লিশটি কাহিনীর সমন্বয়ে রচিত পুরুষপরীক্ষা ’ , মেরুতৃঙ্গের প্রবন্ধচিন্তামণি এবং রাজশেখরের প্রবন্ধকোষ প্রভৃতি নানা গল্পগ্রন্থ সংস্কৃত সাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে ।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন