বাণভট্টের গদ্যরচনার দোষ ও গুণ আলােচনা কর ।

 

संस्कृत साहित्य


২. বাণভট্টের রচনারীতি ও পাণ্ডিত্য সম্পর্কে উদাহরণসহ আলোচনা কর । 

অথবা , উপযুক্ত উদাহরণসহ নিজের ভাষায় বাণভট্টের সমালােচনার বিবরণ দাও । 

অথবা , বাণভট্টের গদ্যরচনার দোষ ও গুণ আলােচনা কর । 


উত্তরঃ- সংস্কৃত গদ্যকাব্যের দরবারে মহাকবি বাণভট্ট রাজাধিরাজ । সমীক্ষকদের মতে গদ্যই কবি প্রতিভার কষ্টিপাথর । 

“ গদ্যং কবীনাং নিকষং বদন্তি । ” 

           তাদের মতে বাণভট্ট সেই পরীক্ষায় অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন । গদ্যকাব্যে বাণের কবিপ্রতিভা যেভাবে সমগ্রতায় পরিপূর্ণ হয়েছে তা তুলনাহীন । ষষ্ঠ শতকের শেষার্ধে বা সপ্তম শতকের প্রারম্ভে হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে মহাকবি বাণভট্ট আবির্ভূত হয়েছিলেন । সমীক্ষকদের মতানুসারে তিনি হর্ষবর্ধনের সভাপতি ছিলেন ।

           মহাকবি বাণভট্ট হর্ষচরিত ’ , ‘ কাদম্বরী ' নামে দুটি গদ্যকাব্য রচনা করেন । এছাড়াও চণ্ডীশতক ’ নামে একটি গীতিকাব্যও রচনা করেছিলেন । হর্ষচরিত ’ আখ্যায়িকা শ্রেণির গদ্যকাব্য । এই কাব্যটির প্রথমাংশে ‘ বাণ ’ তার আত্মজীবনী লিপিবদ্ধ করেছেন । এইকাব্যটি ঐতিহাসিক কাব্যরুপেও চিহ্নিত । কাদম্বরী ’ হল । কথাশ্রেণীর গদ্যকাব্য । কাদম্বরীতে বাণের কবিপ্রতিভা যেন সমগ্রতায় পূর্ণ হয়ে উদ্বেল হয়ে উঠেছে । বিদ মুখমণ্ডলে ধর্মদাস বাণের রচনার প্রশংসা করে বলেছেন—

“ রুচিরস্বরবর্ণপদা রসভাববতী জগন্মনােহরতি । 

তৎ কিং তরুণী ন হি ন হি বাণী বাণস্য মধুরশীলস্য । ”

           কাব্য রচনায় গদ্য ও পদ্যের ভেদ থাকলেও পদ্য রচনা অপেক্ষা গদ্য রচনা অধিক কঠিন । বিশ্বনাথ । কবিরাজের মতে রসাত্মক বাক্যমাত্রই কাব্যপদবাচ্য—

 “বাক্যং রসাত্মকং কাব্যম ।”

“ ওজঃ সমাস ভূয়স্তবম্ এতদ গদ্যস্য জীবিত । ” 

          অর্থাৎ ওজঃগুণ ও সমাসবাহুল্য গদ্যের প্রাণ । আর কেবল গদ্যহলেই তা কাব্য হবে না ; তার জন্য চাই রস , নৈপুণ্য ও বাচনভঙ্গী । শব্দ , অর্থ , শ্লেষাদি অলঙ্কার ও রস ইত্যাদি যখন একীভূত হয়ে প্রকাশিত হয় । তখনই বাক্যটি হয় কাব্যপদবাচ্য । কি জাতীয় কাব্য মানুষের মন জয় করতে পারে সেকথাটি বাণভট্ট স্বয়ং কাদম্বরীর প্রশংসায় বলেছেন—

 “ ক্ষুরস্কলালাপবিলাসকোমলা করােতি রাগং হৃদি কৌতুকাধিকম্ 

রসেন শয্যাং স্বয়মভপাগতা কথা জনস্যাভিনবাবধূরিব ।। ” 

          আনন্দবর্ধন ও মহিমভট্ট প্রভৃতি পণ্ডিতগণের মতে শব্দ , অর্থরস ও অলঙ্কারাদির একত্র সন্নিবেশ কবিপ্রতিভায় আপনা আপনি বেরিয়ে আসে । কাব্যে গদ্যবর্ণনায় বিচিত্র সমাবেশ , অথেরি ঐশ্বর্য , শত শত উদ্যাম কল্পনায় কবির কাব্যে থাকবে অগ্রাম্য বর্ণনা , অক্লিষ্ট শ্লেষ এবং লীলানৃত্য চঞ্চল সমাসবদ্ধ পদের সজো স্বপ্রকাশ অনাড়ষ্ট রস । একত্র এতগুলাে গুণের সমাবেশ যে দুভি একথা বাণ জানতেন , তাই হর্ষচরিতের ভূমিকায় তিনি বলেছেন—

“ নবাহৰ্যো জাতিরগ্রাম্য শ্লেষােইক্লিস্ট ফুটোরসঃ ।।

 বিকটাক্ষরবন্ধশ্চ কৃৎমেমেকত্র দুর্লভম্ ।। ” 

           কাদম্বরী ' শব্দের অর্থ সুরা ’ সুরার মাদকতায় মানুষ যেমন বিভাের হয়ে থাকে তেমনি কাদম্বরী । রসামৃত পানে পাঠকসমাজও আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে । আহারেও তাদের রুচি থাকে না । তাই সমীক্ষক বলেছেন—

 “ কাদম্বরীরসজ্ঞানামাহারােহপিন রােচতে । ” 

          কাদম্বরী কাব্য যে বাণভট্টকে প্রভূত যশ ও জনপ্রিয়তা দান করেছিল তা এই প্রচলিত উক্তি থেকে অনুমেয় । এই কাব্যটিতে কবি শ্লেষ , শব্দপ্রাচুর্য , অলঙ্কার , কথার বর্ণনা প্রভৃতির সহজ সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন । 

🔱 পাত্রচিন্তন : এই কাব্যে পাত্রপাত্রী চিন্তনও আন্যতম । প্রত্যেকটি চরিত্রই যেন জীবন্ত ও সজীব । এখানে শবরসেনা প্রবেশ বৃত্তান্তটি বিস্মৃত করে , তেমনই মহর্ষি জাবালির পরম পবিত্র মনােরম আশ্রমবর্ণনা । পাঠকবর্গকে মুগ্ধ করে । চন্দ্রপীড় ও কাদশীর প্রেমকাহিনী কাব্যটির মুখ্য বিষয় হলেও মহাশ্বেতা ও পুন্ডরীকের সমান্তরাল প্রেম কাহিনী পাঠককে আপ্লুত করে । 

🔱 প্রকৃতি বর্ণনা : প্রাকৃতিক দৃশ্যের বর্ণনায় বাণভট্ট সিদ্ধহস্ত । কাদম্বরীর প্রকৃতি বর্ণনা অত্যন্ত মনােজ্ঞ ও সজীব । কখনও প্রকৃতির রমণীয়তা , কখনও বা পাটলসন্ধ্যার রক্তরাগের বর্ণনা , কখনও পম্পা সরােবরের ভ্রমরগুঞ্জিত পদ্মবনের শােভা প্রভৃতির শান্তস্নিগ্ধ মাধুর্য্যের বিচিত্র বর্ণনা কাব্যটিকে মনােরম করে তুলেছে । 

🔱 রীতি : এই কাব্যে পাঞ্জালী রীতিকে প্রধান ভাবে অনুসরণ করা হলেও স্থানে স্থানে সমাসবহুল গৌড়রীতি এবং সহজ সুন্দর বৈদভী রীতিরও পরিচয় পাওয়া যায় । যেমন শুকনাসের উপদেশ লক্ষ্মীর নিন্দা বর্ণনায় কবি বলেছেন—

“ লপিদুঃ যেন পরিপাল্যতে । ন পরিচয়ং রক্ষতি । 

নাভি জলমিক্ষতে ন রূপ মলােকয়তি না শীলং কশ্যতি । ” 

          বাণভট্টের এই রীতি প্রয়োগ লক্ষ করে আচার্যগণ বলে থাকেন— 

“ অতিরেকেন পাঞ্চালী রীতিঃ , অন্যা অপি রীতরােহল্লাধিকভাবেন পরিলক্ষ্যন্তে । ” 

🔱 গুণ : শ্লেষ , প্রসাদ , সমতা , মাধুৰ্য্য , সুকুমারতা , অথব্যক্তি , উদারতা , ওজঃ , কান্তি , সমাধি— এই দশবিধগুণের মধ্যে কাদম্বরীতে মাধুৰ্য্যগুণেরই প্রাধান্য লক্ষিত হয় , তবে অন্যান্য গুণেরও সমাবেশ আছে । তাই পণ্ডিতগণ বলে থাকেন— 

“ বাহুল্যেন মাধূর্যং গুণঃ , প্রসাদগুণােৎপিন বিরলঃ ।”

          এই কাব্যে প্রধানরস হিসাবে বিপ্রলম্ভ ও শৃঙ্গর এবং অপ্রধানরসরূপে বীররস ও করুণরসের পরিচয় পাওয়া যায় । বাণভট্টের রচনায় মুক্তক , বৃত্তগন্ধি , উৎকলিকাপ্রয় ও চূর্ণক এই চতুর্বিধ গদ্যের সমাবেশ দেখা যায় । অলঙ্কার সন্নিবেশে বাণের সম্মকক্ষ কবি বিরল । প্রায় সকল প্রকার অলঙ্কারই কবি পরিয়েছেন তার কাব্য কামিনীকে । বিশেষ করে শ্লেষানুপ্রাণীত উপমা , বিরােধাভাস , রূপ , উৎপ্রেক্ষা , পরিসংখ্যা প্রয়ােগে কবির উদারতা লক্ষ করার মতো | 

          বাণের রচনাকে সমীক্ষকরা যে উচ্চ প্রশংসা করেছেন তা কেবলমাত্র ভাবােচ্ছ্বাসমাত্র নয় । সহৃদয় অনুভূতির স্বতস্ফূর্ত আবেগেই তারা বলেছেন 

“ বালােচ্ছিষ্টং জগৎ সর্বম । ” 

          বস্তুতঃ জগৎ ও জীবনের এমন কোন তত্ত্ব বা তথ্য নেই যা কবির সুদূরপ্রসারী প্রতিভা রশিতে ধরা পড়েনি, যার অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে কাদম্বরীতে ।

          এই সমস্ত গুণাবলী থাকা সত্ত্বেও তার রচনা যে একেবারে ত্রুটিমুক্ত তা বলা যায় না । সমালােচকদের মতে ভাষার জটিলতায় দীর্ঘ সমাসবদ্ধতায় ও অলঙ্কারের আড়ম্বরে পাঠককূল দিকভ্রান্ত । শব্দ ও অর্থের বিপুল সম্ভার বাণের নৈপুণ্য কোথাও কোথাও সীমা অতিক্রম করেছে । বিদেশি সমালােচকদের সমালােচনায় । বাণভট্ট একেবারেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন । জার্মান অধ্যাপক Weber বলেছেন— “ Bana's prose is an Indian wood where all progress is rendered impossible by the undergrowth , untill the traveller cuts out a path for himself and where even the he has to recon with malicious wild beasts in the shape uncommon words that of right him .

            “ বাণের রচনাকে তিনি ভারতীয় দুর্গম অরণ্যের সাথে তুলনা করেছেন । তার মতে— দীর্ঘ পুঞ্জীভূত সমাস ও দুরূহ শব্দগুলি বন্য জন্তুর মতাে পাঠককে ভয় বিহ্বল করে তােলে । এই প্রতিকূল আলােচনায় অতিশয়ােক্তি আছে সন্দেহ নেই । তকালীন সমাজের রুচিও কবির প্রতিভা , পাণ্ডিত্যের ব্যপ্তি ও গভীরতার ফলে অলঙ্কার বহুল ও সমাসবদ্ধপদের সমাবেশ ঘটেছে বাণভট্টের কাব্যে । বাণের বর্ণ সৌন্দর্য বিকাশের ক্ষমতা প্রশংসার কাছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন— “ কাদম্বরীকারের লাল রঙ কত রকমের তার সীমা নেই । রঙ ফলাতে কবির কী আনন্দ ! যেন শান্তি নেই , তৃপ্তি নেই , সে রঙ শুধু চিত্রপটের রঙ নয় তাতে কবিত্বের রঙ ভাবের রঙ আছে । ” 

          বর্তমানের দৃষ্টিভঙ্গীতে অতীতের বিচার করা চলে না । তথাপি সামগ্রিক বিচারে বলা যায় যে বাণভট্টের বহুমুখী প্রতিভা , পাণ্ডিত্য ও সংস্কৃত ভাষায় অগাধ অধিকার তাকে এমন সার্বভৌম প্রতিষ্ঠার গৌরব দিয়েছেন । যার জন্য তিনি সংস্কৃত গদ্যকাব্যে অদ্বিতীয় ।


———— 🌹———

Sanskrit College/ Course- B.A.

মন্তব্যসমূহ