দণ্ডিণঃ পদলালিত্যম্ (সংস্কৃত গদ্য সাহিত্যের অন্যতম মহাকবি দন্ডী)

संस्कृत साहित्य


 প্রশ্ন : ‘ দণ্ডিণঃ পদলালিত্য ’ ব্যাখ্যা কর ।


উত্তরঃ- সংস্কৃত গদ্য সাহিত্যের ' ত্রয়ীর অন্যতম প্রতিভাধর কবি হলেন মহাকবি দী । অবন্তিসুন্দরীকথা ’ নামক গদ্যকাব্যে মহাকবি দণ্ডীর ব্যক্তিজীবন কিয়ৎপরিমাণে আলােকিত । কিরাতাজুনীয় মহাকাব্য রচয়িতা মহাকবি ভারবি ছিলেন দণ্ডীর প্রপিতামহ । তার পিতা - মাতা ছিলেন যথাক্রমে বীরদত্ত ও গৌরীদেবী । দক্ষিণভারতে কাঞী নগরীতে দণ্ডীর পিতৃপুরুষদের বাসস্থান ছিল । তিনি খ্রীস্ট্রীয় সপ্তম শতকের কবি । নশকুমারচরিত , অবন্তিসুন্দরীকথা ও কাব্যাদর্শ নামক অলঙ্কারগ্রন্থ দণ্ডীর রচনা বলে অনুমিত হয় । 

     সংস্কৃত সাহিত্যে মহাকবি দণ্ডী এক বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী । সংস্কৃত সাহিত্যের অন্যতম প্রতিভাধর কয়েকজন কবির কাব্যগুণের স্বীকৃতিস্বরূপ একটি প্রসিদ্ধ শ্লোক রয়েছে । শ্লোকটি হলাে— 

উপমা কালিদাসস্য ভারবেরর্থগৌরবম্ । 

দণ্ডিণঃ ( নৈষধে ) পদলালিত্যং মাঘে সন্তি এয়াে গুণাঃ ।। 

     মহাকবি কালিদাস উপমা , মহাকবি ভারবি অর্থগৌরব এবং মহাকবি দণ্ডী ও শ্রীহর্ষ পদলালিত্য গুণের জন্য বিখ্যাত । আর উক্ত কাব্যগুণ তিনটির একত্রে সন্নিবেশ ঘটেছে মহাকবি মাঘের মধ্যে । পদলালিত্য অর্থাৎ ললিত পদনিবন্ধন একটি কাব্যিক গুণ পদলালিত্য ললিত পদবন্ধন । ললিতের ভাব বা ললিত গুণ বিশিষ্ট লালিত্য । পদলালিত্যের ব্যাখ্যায় লীলাবতী বলেছেন— ‘সংক্ষিপ্তাক্ষর কোমলমলপদৈর্লালিত্যলীলাবতীম্’ । সংক্ষিপ্ত দীর্ঘসমাস সন্ধি বিহীন সুন্দর পদরচনাই পদলালিত্য ।

    মহাকবি দণ্ডী সন্ধি - সমাসের অতিশয় প্রয়ােগে তাঁর রচনাকে ভারাক্রান্ত করেন নি । পরবর্তী কবি সাহিত্যিকগণ দণ্ডীর কাব্যসাধনায় চিরাচরিত কাব্যশৈলী থেকে স্বাতন্ত্র্য লক্ষ্য করে তাকে বাশ্মীকি ও ব্যাসের সঙ্গে একাসনে বসিয়েছেন—

জাতে জগতি বাল্মীকৌ কবিরিত্যভিধাহভবৎ । 

কবী ইতি ততাে ব্যাসে কয়য়ি দণ্ডিনি ।। 

     শৈশবে পিতৃমাতৃহীন হয়ে দণ্ডী সরস্বতী ও শুত নামক এক দম্পতির আশ্রয়ে লালিত পালিত ও বর্ধিত হন । এই সময় তিনি বিভিন্নস্থানে পরিভ্রমণের মাধ্যমে বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন । 

     বাল্মীকি ও ব্যাসদেবের উত্তরাধিকার সমৃদ্ধ মহাকবি দণ্ডী সংস্কৃত সাহিত্যের এক অন্যতম ব্যতিক্রমী প্রতিভা । কিরাতাজুনীয় মহাকাব্যের কবি ভারবির হাত ধরে , কালিদাসােত্তর যুগে সূচিত হয় কৃত্রিম কাব্যের যুগ । সন্ধি - সমাসের আড়ষ্টতায় , দুরূহ শব্দের ঝঙ্কারে , অলঙ্কার শাস্ত্রের নিগড়ে আবদ্ধ হয়ে রচিত হতে থাকে কৃত্রিম কাব্য সমূহ । সাবলীলতার পরিবর্তে ব্যাখ্যাগম্যতাই শ্রেষ্ঠ কাব্যের মানদণ্ডরূপে বিবেচিত হতে থাকে । মহাকবি ভারবি , মাঘ , ভটি এবং পরবর্তী কালের গদ্যকবি সুবন্ধু , বাণভট্ট প্রমুখ তাঁদের রচনায় অলঙ্কারশাস্ত্রের বিধি নিয়মকেই প্রাধান্য দিয়েছেন । মহাকবি দণ্ডী সেই কৃত্রিমকাব্যযুগের প্রতিনিধি হয়েও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল । রাজপ্রসাদের কেন্দ্রীকতাকে উপেক্ষা করে রাজপরিবারের পাশাপাশি অবহেলিত সমাজের দিকেও কবি সমান দৃষ্টি দিয়েছেন । ফলে তস্কর , জুয়াড়ী , বাভিচারী , নারীহরণকরী , ধুর্ত , জাদুকর প্রভৃতি চরিত্র উপযুক্ত মর্যাদায় উঠে এসেছে দণ্ডীর রচনায় । সাধারণ পাঠক - পাঠিকাদের কথা মনে রেখেই দণ্ডী তার রচনায় কৃত্রিম কাব্য রচনার সমকালীন ভাবনা চিন্তার পরিবর্তে সহজবােধ্য সাবলীল কাব্যরীতিকেই অবলম্বন করেছেন । 

     অলঙ্কারশাস্ত্রে ওজোগুণসম্পন্ন সমাসবহুল রচনাকেই গদ্যের প্রাণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে— “ ওজঃ সমাসভূয়স্তমেতদ গদ্যস্য জীবিত ’ তথাপি দণ্ডী তার কাব্যে ওজঃ গুণকে গ্রহণ করলেও দীর্ঘ সমাসবদ্ধ পদের বহুল প্রয়ােগ বর্জন করেছেন । প্রায় সমকালীন অপর গদ্যকবি সুবন্ধু ও বাণভট্ট তাদের রচনায় দীর্ঘ সন্ধি ও সমাসবদ্ধ পদের ব্যবহার করলেও দণ্ডী তাঁর রচনায় ললিত পদবন্ধনকেই মুখ্যতঃ অবলম্বন করেছেন । দশকুমার চরিতের রাজবাহনচরিতেও দণ্ডীর পদলালিত্যপূর্ণ রচনার প্রভূত উদাহরণ বিদ্যমান ।

     উপযুক্ত শব্দচয়ন পদলালিত্যের অন্যতম শর্ত । মহাকবি দণ্ডীর শব্দচয়নকুশলতা অপূর্ব শব্দ ও অর্থের আশ্চর্যমণিকাঞন যােগ লক্ষ্য করা যায় দণ্ডীর রচনায় । অলঙ্কার প্রয়ােগে দণ্ডী আশ্চর্য ক্ষমতার অধিকারী । উপমা , উৎপ্রেক্ষা , রূপক প্রভৃতি অলঙ্কার কবি যথােপযুক্ত স্থানে ব্যবহার করেছেন । এসব অলঙ্কারের প্রয়ােগে বর্ণনীয় বিষয় অধিকতর সমৃদ্ধি লাভ করেছে । দশকুমারচরিতের পাঠ্যাংশ রাজবাহনচরিতে নবব , অবন্তিসুন্দরী পতি রাজবাহনকে শৃঙ্খলিত দেখে কাতর ক্রন্দনে দিগবিদিক জ্ঞানশূন্যা । অঙ্গরাজ সিংহবর্মাণ পরাক্রমের বর্ণনায় উপমা অলঙ্গর প্রয়ােগ করে কবি বলেন — ‘ চম্পেশ্বরােহপি সিংহবর্মা সিংহইব অসহ । বিক্রমঃ’। দণ্ডী সহজ সাবলীল গদ্যরীতির প্রশংসা করে পাশ্চাত্য সাহিত্য সমালােচক winternitz বলেন— “In respect of Language Dandin shows himself as a master of the kavyastyle overludened with establishment that of course alternate with simple language of the plain narrator .”

     দশকুমারচরিত ছাড়াও অবন্তিসুন্দরীকথা , কাব্যাদর্শ ও ছন্দোবিচিত নামক অলঙ্কারগ্রন্থও দণ্ডীর রচনা বলে মনে করা হয় । সংস্কৃত সাহিত্যে মহাকবি দণ্ডীর কবিখ্যাতি বিস্ময়করভাবে প্রসারলাভ করেছিল । দণ্ডীর সদর্থক সমালােচকগণ তাই বলেন — কবিদণ্ডী কবিদণ্ডীন সংশয়ঃ ।


———— 🌹————


অন্যান্য প্রশ্ন-উত্তর---

বানভট্টের গদ্য রচনা আর দোষ ও গুণ আলোচনা কর

সংস্কৃত গল্প সাহিত্যের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা কর




মন্তব্যসমূহ